
লালমনিরহাটের ডিসি রকিব হায়দার: যার কাছে ‘মামলা সহজ, সাংবাদিক কঠিন’; নিয়োগ থেকে ত্রাণ-সবখানেই বিতর্কের ছায়া
লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধিঃ——জনগণের সেবক হিসেবে নয়, বরং দাপুটে ও বিতর্কিত আচরণের কারণে লালমনিরহাটে এখন টক অব দ্য টাউন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এইচএম রকিব হায়দার। সম্প্রতি নিয়োগ পরীক্ষায় হরিজন সম্প্রদায়ের সাথে বৈষম্য এবং সাংবাদিকদের ‘ফেস করা’ নিয়ে তার বিতর্কিত মন্তব্য জেলা প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা থেকে শুরু করে জনদুর্ভোগে উদাসীনতা। সব মিলিয়ে লালমনিরহাটে এক অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে।
গত ৫ ও ৬ ডিসেম্বরের ঘটনা জেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। গত ৫ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ৩৯ জন স্টাফ নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ উঠেছে, ‘পরিচ্ছন্নকর্মী’ পদের জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অত্যন্ত কঠিন প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়েছে যাতে বংশপরম্পরায় এই কাজ করে আসা হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষরা বাদ পড়েন। এর প্রতিবাদে ৬ ডিসেম্বর (শনিবার) ঝাড়ু হাতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে ‘বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদসহ তাদের একাধিক সংগঠন’। আন্দোলনকারীদের দাবি, ঐতিহ্যগত অগ্রাধিকার খর্ব করে নিয়োগ বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত করতেই এই কৌশল নিয়েছেন ডিসি।
যদিও ডিসি রকিব হায়দার এই অভিযোগ অস্বীকার করে দায়সারা মন্তব্য করেছেন। এর আগে তিস্তা পাড়ের চার দফা বন্যায় যখন জনজীবন বিপর্যস্ত, তখন ডিসি দাবি করেছিলেন ‘বন্যা তেমন বড় হয়নি’। পরবর্তীতে চাপের মুখে ত্রাণ দিলেও মোট বরাদ্দের পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের সাথে অশোভন আচরণ করেন। একটি ভাইরাল হওয়া কল রেকর্ডে তাকে বলতে শোনা যায়, “সব শেষ হয়ে গেছে, নতুন করে এই জিনিস উপস্থাপনের দরকার নাই… আল্লাহ হাফেজ।” তথ্য লুকাতে তার এই তড়িঘড়ি ফোন কেটে দেওয়ার ঘটনাটি প্রশাসনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এর আগে আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ সংক্রান্তে তথ্য সংগ্রহ করতে জেলা প্রশাসকের কক্ষে গিয়ে যমুনা টিভি ও দেশ টিভির প্রতিনিধিরা ডিসির রোষানলে পড়েন। সে সময় ডিসি ইউএনও-র সাথে ফোনে কথা বলতে গিয়ে বলেন, “মামলা ফেস করার চেয়ে সাংবাদিক ফেস করা কঠিন।” এই বক্তব্যটি গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এরপর থেকেই ডিসি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলেন এবং তথ্য অধিকার আইনকে তোয়াক্কা না করে সরকারি ফোন রিসিভ করা বন্ধ করে দিয়েছেন। এমনকি তথ্য সংগ্রহে গেলে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন চেক করার মতো ঔদ্ধত্যও তিনি দেখিয়েছেন।
নভেম্বরের শেষে জেলার মহেন্দ্রনগর নিকটবর্তী স্থানে বাফারগোডাউনের পাশে নির্মাণাধীন একটি কালভার্টের পাশে অস্থায়ী সড়কে ট্রাক উল্টে যোগাযোগ ব্যবস্থা সাত দিন বন্ধ থাকলেও ডিসি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। পরে ২৯ নভেম্বর মিশন মোড়ে এক অবস্থান কর্মসূচিতে জেলার সচতন মহল ফুঁসে ওঠে। যেখানে বিএনপি নেতা অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু অংশ নেয়। ওই মানববন্ধনে বক্তারা লালমনিরহাটের প্রশাসনকে ‘অথর্ব’ আখ্যা দিয়ে বক্তব্য রাখেন। বক্তরার বলেন, জেলা প্রশাসকের উদাসীনতায় অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত যাওয়ার পথ পায়নি। গ্রামীণ রাস্তাগুলো ধ্বংস হলেও জেলা প্রশাসক নির্বিকার। পরে অবশ্য সড়ক ও জনপদ বিভাগ বিকল্প সড়ক দায়সারা ভাবে নির্মান করে।
এর আগে গত ৩০ মার্চ জেলা প্রশাসনের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মঞ্চের ম্যুরাল ভেঙে ফেলার ঘটনায় ১ এপ্রিল বাম রাজনৈতিক দলগুলো (সিপিবি-ন্যাপ) ডিসির অপসারণ দাবি করে মানববন্ধন করে।
অভিযোগ উঠেছে, উপ-সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে ফুল দেওয়া এই কর্মকর্তা মূলত আওয়ামী লীগের বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট। মেট্রোরেল প্রকল্পে পরিচালক থাকাকালীন তার কর্মকাণ্ড ও বর্তমান আচরণে তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি উত্তরের জেলা লালমনিরহাটে শীত জেকে বসলে সংবাদ প্রকাশ করে শ্রমজীবী, ছিন্নমূল মানুষজনের দূর্ভোগ তুলে ধরা শুরু করেন সাংবাদিকরা। এমন সংবাদ প্রকাশে মনঃক্ষুণ্ন হন ডিসি বলে দাবি করেন একাধিক গণমাধ্যম কর্মী। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কি পরিমাণ কম্বল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা জানতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান বাংলাদেশ প্রেসক্লাব নামের একটি সংগঠনের লালমনিরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদেকুল ইসলাম। ডিসির কক্ষে ওই সাংবাদিক প্রবেশ করতেই মোবাইল নিয়ে গোপনে ভিডিও চালু আছে কিনা তা চেক করেন জেলা প্রশাসক। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক সাদেকুল বলেন, জেলা প্রশাসকের এমন আচরণ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অস্বশনি সংকেত।
সাংবাদিকদের অসহযোগিতা মুলক আচরন ডিসি এমন প্রসঙ্গে সাংবাদিক নেতা লাভলু শেখ বলেন, সংবাদ প্রকাশের স্বার্থে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যেতে হয় সাংবাদিকদের। কিন্তু জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার সাংবাদিকদের উপর ক্ষিপ্ত। জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে এই সাংবাদিক নেতা বলেন, সাধারণ মানুষ কিংবা সাংবাদিক কারো সাথে আচরণ ভালো করেননা ডিসি। প্রশ্ন তুলেন আগামী নির্বাচনে কতটুকু সততার সাথে দ্বায়িত্ব পালন করতে পারবেন তা নিয়েও।
সাংবাদিক নেতা এস আর শরিফুল ইসলাম রতন বলেন, তথ্যের জন্য একাধিকবার সরকারি মোবাইল নাম্বারে কল করলেও জেলা প্রশাসক তার ফোন রিসিভ করেন না। এমনকি কার্যালয়ে গেলেও সাংবাদিকদের সাথে দেখা করেন না ডিসি। সম্প্রতি রবিদাস সম্প্রদায় একটি স্মারক লিপি দিতে গেলে তা গ্রহন করেননি জেলা প্রশাসক। মানুষের মাঝে ভেদাভেদ তৈরী করে নানা সময় আলোচনায় থাকা ডিসি শুধু সাংবাদিক নয়, সাধারণ মানুষের সাথে দুরত্বের সৃষ্টি করেছেন। একাধিকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সমালোচনা হলেও আচরণে পরিবর্তন আনেননি ডিসি। আগামী নির্বাচনে ডিসির নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করা নিয়েও সংশয় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন এই সাংবাদিক নেতা।
যদিও ৩ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় ডিসি ‘আল্লাহকে হাজির-নাজির’ মেনে নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে তার বিতর্কিত অতীত এবং আওয়ামী ঘনিষ্ঠতার কারণে আসন্ন নির্বাচনে তার ভূমিকা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় সৃষ্টি করেছে।সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- যিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলেন এবং সুবিধাবঞ্চিতদের স্মারকলিপি গ্রহণ করেন না, তিনি কতটুকু জনবান্ধব হতে পারবেন?
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচএম রকিব হায়দারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি প্রথাগতভাবে ফোন ধরেননি।
মন্তব্য করুন