
স্টাফ রিপোর্টারঃ———-২০ নভেম্বর শীতের ভোর। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার শান্ত-নির্জন পাকুড়িয়া গ্রামের সকালটা অন্যসব দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কচি রোদের আলো যখন ধীরে ধীরে কুয়াশার চাদর ভেদ করে উঠছিল, তখনই গ্রামের প্রতিটি ঘর-বাড়িতে জীবন জেগে উঠছিল তার নিজস্ব ছন্দে। পাখিদের কিচিরমিচিরে যেন একটা নিরাময় আর স্বস্তির সকাল। যে সকাল ভাঙতে না চাওয়ার মতো।
এই স্বাভাবিক সকালের মাঝেই ছিল মোল্যা বাড়ির স্নিগ্ধ হাস্যরোল। ছোট্ট জায়ান রহমান—পলাশ মোল্যা ও সিনথিয়া বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে। বয়স মাত্র সাত। কিন্তু তার প্রাণচাঞ্চল্যে পুরো বাড়িকে ছুঁয়ে যেত আলাদা প্রাণ।
স্কুলে যাওয়ার তাড়াহুড়ো, ব্যাগ গুছানো, মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে হাসি—সব মিলিয়ে সে যেন বাড়ির প্রাণভোমরা।
স্কুল শেষে বাসায় ফিরে একটু খেলাধুলা, তারপর বিকেলের নরম আলোয় উঠোনময় ছুটোছুটি—এই ছিল তার প্রতিদিনের রুটিন। টানা এক সপ্তাহের ক্লাস শেষে ছুটি—জায়ানের চোখেমুখে ছিল বাড়তি আনন্দের উচ্ছ্বাস। কে জানতো, এই উচ্ছ্বাসই হবে তার জীবনের শেষ অভিব্যক্তি?

দুপুরে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই ছেলেটি নিখোঁজ। প্রথমে কেউ গুরুত্ব দেয়নি—ভাবা হয়েছিল হয়তো পাশের বাড়িতে খেলতে গেছে, কিংবা বাগানে দৌড়াদৌড়ি করছে। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, পরিবারের বুকের ভেতরে অস্থিরতা বাড়তে থাকে।
গ্রামের লোকজন ছুটে আসে খুঁজতে। ডোবা, পুকুর, বাগান, বাড়ির পিছন—কোথাও পাওয়া যায় না।
এরপর হঠাৎই কেউ চিৎকার করে ওঠে। সবাই দৌড়ে যায় বাড়ির পশ্চিম পাশে থাকা বাগানে।
আর সেখানেই দেখা যায় মর্মান্তিক দৃশ্য—
একটি গাছের ডালের সাথে রশিতে ঝুলছে ছোট্ট জায়ানের অর্ধনগ্ন নিথর দেহ।
সেই দৃশ্য এতটাই পাষাণ ভেদ করা, এতটাই বীভৎস—যে মুহূর্তেই চারপাশের বাতাস যেন স্তব্ধ হয়ে যায়।
মা সিনথিয়া যখন ছেলের মৃতদেহটি দেখলেন, এক মুহূর্তে তাঁর পৃথিবীকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। তার গগনবিদারী আর্তনাদে কেঁপে ওঠে পুরো গ্রাম।
তিনি লুটিয়ে পড়েন মাটিতে—চুল মুখ এলোমেলো হয়ে যায়, বুক চাপড়াতে থাকেন অসহায় যন্ত্রণায়।
চাচারা, ফুফুরা, দাদা-দাদী মামা খালাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল চারপাশ। কেউই কাউকে সামলাতে পারছিলেন না। স্বান্তনা দেয়ার মত কোন শব্দ কারো কাছে ছিলনা। চারপাশ থেকে গোঙ্গানি, ছটফট আর আহা আহা শব্দে মাতমে রুপ নিয়েছিল৷
সেই কান্নার শব্দ চারপাশের গাছপালাও যেন ধরে রাখতে পারেনি। কেউ কেউ নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যায়, আবার কেউ হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে জায়ানের নিথর শিশুমুখের দিকে।
যে মুখে একসময় লেগে থাকত কেবলই হাসি, খিলখিল শব্দ, নিষ্পাপ দুষ্টুমি।
পাকুড়িয়া গ্রামে সেদিন নেমে এসেছিল এক অবর্ণনীয় শোক। সে শোকের নিস্তব্ধতার আকাশ ঢেকে গিয়েছিল বিশাল নির্মমতা ও নৃশংশতার কলংকিত কালো অধ্যায়ে।
পলাশ মোল্যা তখন গ্রীসের এথেন্স শহরে। রোজকার কাজের ব্যস্ততা ছাপিয়ে ভেতরে ছিলো দূরদেশে থাকা ছেলের মুখ দেখার অপেক্ষা।
নিখোঁজের খবর প্রথমে তাকে উদ্বিগ্ন করলেও তিনি বিশ্বাস করেছিলেন—খুঁজে পাওয়া যাবে।
কিন্তু যখন জানানো হলো ছেলেটি আর নেই, তখন যেন তার পুরো দুনিয়া এক মুহূর্তে থেমে গেল।
ফোনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল ছেলের ঝুলন্ত দেহ।
হাজার হাজার মাইল দূরে বসে তার কিছুই করার ছিল না—না ছেলেকে কোলে নেওয়া, না বুকে চেপে ধরা, না শেষবার মাথায় হাত বুলানো।
শুধু চোখের সামনে ভেসে উঠছিল:
—ছেলের ছোট ছোট বই
—পেন্সিল
—ফোকলা দাঁতের হাসি
—সাইকেল চালানোর খিলখিল শব্দ
—আর সেই প্রতিদিনের প্রশ্ন—“বাবা, তুমি কবে বাড়ি আসবা?”
শেষ ভিডিও কলে জায়ান তাকে বলেছিল,
“বাবা, আমি ফ্যান ছুইলেই তুমি দেশে আসবা—ঠিক?”
বাবা হেসে বলেছিলেন,
“হ্যাঁ, তুমি যখন মাথার উপরের ফ্যানটা ছুঁতে পারবা, আমি তখনই দেশে আসব।”
সেই ফ্যান ছোঁয়ার স্বপ্ন আর কোনোদিনই পূর্ণ হবে না জায়ানের।
পলাশের প্রবাস জীবনের সমস্ত কষ্ট, আশা, ঘাম, পরিশ্রম—সবই যেন ছেলের দেহের সাথে গাছের ডালে ঝুলে রইল। এ এক আকাশসম বিশালতা ভরা নীল কষ্টের উপাখ্যান।
সিনথিয়া বেগম প্রতি রাতে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে কত স্বপ্ন দেখতেন।
ছেলে বড় হবে, পড়ালেখা শিখবে, মানুষ হবে, গ্রামময় ঘুরে বেড়াবে মোটরবাইকে করে, বাবা-মায়ের কষ্ট ঘুচাবে। বৃদ্ধ বয়সে সে হবে ভরসার হাত। আজ সেই সব স্বপ্ন ঝুলে আছে একটি গাছের ডালে—অসহায়, নিথর, নিশ্চুপ।
জায়ানের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় ঘটনার পরদিন।
পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে হত্যাকাণ্ড বলেই মনে করছে।
ইউনুস মোল্যা নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আরো আসামিরা পলাতক।
পুরো গ্রাম দাবি তুলেছে—
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
যেন আর কোনো জায়ানকে এভাবে মরতে না হয়। মা সিনথিয়া বেগম প্রশাসনের কাছে দৃঢ় দাবী তুলেছেন, ছেলের কবরের মাটি শোকানোর আগেই হত্যাকারীদের গ্রেফতার করতে হবে। পালিয়ে থাকা খুনিরা এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ওদের ধরেন, শাস্তি দেন। আমার কলিজা একটু শান্তি পাক।
পলাতক থাকা অন্যান্য খুনিদের গ্রেফতারের দাবীতে জায়ানের নিজ গ্রাম পাকুড়িয়া ও থানা সদরে মোট দুইবার মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী। নানা শ্রেণী পেশার মানুষ জোর কন্ঠে দাবী তুলেছে, নির্মম হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। শীঘ্রই খুনিরা ধরা পড়বে। দৃষ্টান্ত মূলক বিচারও হবে৷ মানুষ বিচার দেখে তৃপ্ত হবে৷ এ জনপদের মানুষ সুষ্ঠ বিচার প্রাপ্তীর মাধ্যমে কিছুটা হলেও কলংক মুক্ত হবে৷ কিন্তু ফিরবে কি মায়ের কোরে দুষ্টুমিষ্টি জায়ান৷ বাবার কিনে দেয়া লাল সাইকেলে স্কুল মাঠ দাঁপিয়ে বেড়াবে? কিংবা জায়ানের ফুটবল কি আর গড়াবে পাড়ার বৃষ্টি ভেজা মাঠে?
জায়ানের দৌড়ঝাঁপ, খিলখিল হাসি, কান্না, আদর, দুষ্টুমি,
উঠোনের মাটিতে তার ছোট্ট পায়ের ছাপ, বা মায়ের আঁচলে লুকিয়ে থাকা লাজুক মুখ।
জায়ানের শূন্য পড়ে থাকা দোলনায় কি আর কেউ দোল খাবে?
এথেন্সের নীল সমুদ্র, পাহাড়ি ভূমি আর ব্যস্ত শহরের মাঝেও পলাশ মোল্যার চোখে এখন শুধু শূন্যতা।
আগের স্বপ্নগুলো আজ ভেঙে গেছে। সন্তান হারানোর ব্যথা তার বুককে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে।
মা মাটি স্বজন ছাড়া হাজার মাইল দূরের একাক
মন্তব্য করুন