মনির হোসেন।
৮ এপ্রিল ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

যশোর জেনারেল হাসপাতাল কেন্দ্রিক প্রতারক সিন্ডিকেট জীবন নিয়ে ভয়ঙ্কর খেলা!

যশোর জেনারেল হাসপাতাল কেন্দ্রিক প্রতারক সিন্ডিকেট
জীবন নিয়ে ভয়ঙ্কর খেলা!

যশোর জেলা প্রতিনিধি:———-

রীতিমত মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করছে যশোর জেনারেল হাসপাতাল কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধ একটি প্রতরক চক্র। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রোগীদের হাতে ভুয়া রিপোর্ট ধরিয়ে দিয়ে ভয়ংকর সব প্রতারণায় লিপ্ত হয়েছে। অনেকটা হাসপাতালের নিয়মিত স্টাফের মতই কথিত সেচ্ছাসেবক ও চিহ্নিত দালালেরা দিনের পর দিন এই অপকর্ম করে চলেছে যশোরে জেলার সর্ববৃহৎ এই সরকারি হাসপাতালে।

ভুয়া রিপোর্টের কারণে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন মানুষ। আবার মৃত্যুর মুখেও পতিত হচ্ছেন রোগী। সম্প্রতি প্রতারক চক্রে মনগড়া ভুয়া মেডিকেল রিপোর্টের কারণে এক রোগীর মৃত্যুও ঘটেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, শহরের বেসরকারি কুইন্স হাসপাতালের নাম ব্যবহার করেও জাল রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। শুধু নামই নয়, ওই হাসপাতালের প্যাড, লোগো, এমনকি চিকিৎসকদের স্বাক্ষরও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নকল করা হচ্ছে, যা দেখে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল-নকল পার্থক্য বোঝা অসম্ভব।

৬ এপ্রিল বিকেলে যশোর জেনারেল হাসপাতালের পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন এক রোগী। চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিতে বললে, ওয়ার্ডে থাকা সেচ্ছাসেবকরা বাইরের দালালদের ডেকে এনে রোগীর নমুনা সংগ্রহ করেন। কিন্তু কোনো ল্যাবে পরীক্ষা না করেই রোগীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে রাতে একটি রিপোর্ট ধরিয়ে দেয়া হয়। সেদিন রাতেই রোগীর মৃত্যু হলে সন্দেহ তৈরি হয় স্বজনদের মধ্যে। পরবর্তীতে রোগীর স্বজনরা কুইন্স হাসপাতালে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, রিপোর্টটি সম্পূর্ণ ভুয়া। তাদের প্যাড, এমনকি চিকিৎসকের স্বাক্ষরও জাল করা হয়েছে।

আর এই কাজটি যশোর জেনারেল হাসপাতালের ভয়ঙ্কর একটি প্রতারক সিন্ডিকেটের। যারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রোগীদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে ভুয়া রিপোর্ট! আর এই চক্রের সাথে সরাসরি জড়িত হাসপাতালের ওয়ার্ডে দায়িত্বরত কিছু সেচ্ছাসেবক।

এরপর ৭ এপ্রিল কুইন্স হাসপাতালের একটি প্রতিনিধি দল যশোর জেনারেল হাসপাপাতালের ওয়ার্ডে গিয়ে আরও বেশ কয়েকজন রোগীর কাছ থেকে একই ধরনের জাল রিপোর্ট উদ্ধার করেন।

তথ্য মিলেছে, রোগী ও অভিভাবকদের প্রতারণার জালে ফাঁসাতেই ওই চক্রের সদস্যরা নিয়মিতভাবে হাসপাতালের ওয়ার্ডে অবস্থান করে। সেচ্ছাসেবকের পরিচয়ে তারা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং বিভিন্ন পরীক্ষার কথা বলে বাইরে থেকে নমুনা সংগ্রহের প্রস্তাব দেয়। পরে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই অতি গোপনে আশেপাশের কোনো কম্পিউটার দোকান ও অখ্যাত গোপন ল্যাব থেকে জাল রিপোর্ট প্রিন্ট করে তা রোগীদের হাতে তুলে দেয়। এ ঘটনায় হাসপাতালের কথিত সেচ্ছাসেবক লিটন দাস, নাজমুল ইসলাম এবং দালাল রোহানের নাম উঠে এসেছে জোরেসোরে। নেপথ্যে রয়েছে আরো কয়েকজন। যদিও অভিযুক্ত ওই চক্রটির প্রত্যেকেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।

তবে ভুক্তভোগীদের মধ্যে বাঘারপাড়া উপজেলার চাড়াভিটা গ্রামের ইব্রাহীম জানিছেন, তিনি শ্বাসকষ্ট নিয়ে ৫ এপ্রিল পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। চিকিৎসক তাকে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিতে বললে দায়িত্বরত সেচ্ছাসেবকরা এক দালালের মাধ্যমে তার কাছ থেকে ১ হাজার ৬শ’ টাকা নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট দেন। কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ভূয়া রিপোর্ট প্রদান করে চক্রটি। ধরা পড়ার পর দালাল চক্রের সদস্যরা তার ফোন রিসিভ করছেন না। আর সেচ্ছাসেবকরা বিষয়টি অস্বীকার করছেন।

সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা গ্রামের সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি দুই দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হন। রোহান নামে এক দালাল কুইন্স হাসপাতালের কথা বলে তার কাছ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা নিয়ে পরীক্ষা করান। পরে তিনি জানতে পারেন রিপোর্টটি একবারেই ভুয়া। কুইন্স হাসপাতালে ওরা যায়ইনি। নিজেরাই মনগড়া রিপোর্ট প্রিন্ট দিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, তারা সাধারণ মানুষ কিভাবে বুঝবেন, কোনটা আসল আর কোনটা ভুয়া? হাসপাতালে দালালরা কিভাবে ঢোকে, যদি ভেতরের কারও সহযোগিতা না থাকে? এখন আবার নতুন করে পরীক্ষা করাতে হবে। সেই টাকা কে দেবে? এসব নানা প্রশ্ন তোলেন সাইফুলসহ আরো অনেকে।

এদিকে, হাসপাতালের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, সংঘবদ্ধ ওই চক্রটি দীর্ঘদিন এভাবে প্রতারণা চালিয়ে আসছে। সেচ্ছাসেবকরা দালাল ডেকে এনে নমুনা সংগ্রহ করে এবং পরে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া রিপোর্ট প্রিন্ট করে রোগীদের দেয়। আর মধ্যসত্বভোগী হয়ে যায় এক শ্রেণির কর্মচারী। অনেকেই ওই টাকার ভাগ পায় বলেই চক্রটি হাসপাতালে ঢুকে এ ধরণের লোমহর্ষক প্রতারণাগুলো করে যাচ্ছে।

কুইন্স হাসপাতালের আইটি ম্যানেজার হাসান ইমাম শিমুল জানান, বিষয়টি জানার পরই তারা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জনের কাছে অভিযোগ করেছেন। একই সাথে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

এদিকে ভয়ানক এসব ঘটনার ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার হুসাইন সাফায়েতের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি খুবই নিন্দিনীয়। জড়িতদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি জেলা মাসিক আইনশৃংখলা কমিটির সভায় তোলা হবে। একইসাথে প্রাথমিকভাবে খোঁজখবর নিতে আরএমওকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অন্যায় করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বেনাপোলে সরকারি হাসপাতালের দাবিতে উত্তাল রাজপথ

মায়ের ওপর অভিমান করে ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি

রংপুরে ফেন্সিডিলসহ আটক মধ্য রাতে দল থেকে বহিষ্কার

দর্শনায় পুলিশের ঝটিকা অভিযান: ৬৫ পিস ইয়াবাসহ কুখ্যাত মাদক কারবারি নুরু আটক

২১ এপ্রিল পরীক্ষা শুরু এসএসসিতে এবার যশোর শিক্ষা বোর্ডে ৬ হাজার ৪০১ পরীক্ষার্থী কমেছে

নাগেশ্বরীতে শিক্ষকতার আড়ালে পৈশাচিকতা: ছাত্রকে বলাৎকারের ঘটনায় পলাতক শিক্ষক ওমর ফারুক

দামুড়হুদায় খেলতে গিয়ে পুকুরে পড়ে শিশুর মৃত্যু।

লালমনিরহাটে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের স্মরণে বিশেষ গেরিলা বাহিনীর স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত।

ফরিদগঞ্জের বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সহকারি এটর্নি জেনারেল এড. ফারুক হোসেনের গণসংযোগ

চুয়াডাঙ্গায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং ভোগান্তিতে শিশু ও শ্রমজীবী মানুষ, বাড়ির বাইরে অবস্থান

১০

দামুড়হুদায় খেলতে গিয়ে পুকুরে পড়ে শিশুর মৃত্যু

১১

লালমনিরহাটে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের স্মরণে বিশেষ গেরিলা বাহিনীর স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত

১২

আলফাডাঙ্গায় মাছের সঙ্গে এ কেমন শত্রুতা!

১৩

সালথায় রাতের আঁধারে   টর্চলাইট জ্বালিয়ে সংঘর্ষে আহত ৩০, বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ

১৪

স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার অঙ্গীকার: চুয়াডাঙ্গায় কনস্টেবল নিয়োগের প্রথম দিন সম্পন্ন

১৫

কুড়িগ্রামে নিখোঁজের ১২ ঘণ্টা পর শিশুর মরদেহ উদ্ধার, হত্যার অভিযোগ পরিবারের

১৬

যশোর কেশবপুর উপজেলায় নববধূর গর্ভে ৬ মাসের সন্তান !

১৭

মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধে ঘাটতি: এনপিএস চেয়ারম্যান মাহবুবুল ইসলামের

১৮

ভাঙ্গায় রেভারেন্ড পল মুন্সীর স্মরণে ফ্রী মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত

১৯

ফরিদপুরে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরে কিন্ডার গার্টেন স্কুলে বর্ষবরণ

২০
বিজ্ঞপ্তি