
বিশেষ প্রতিনিধিঃ———-ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় অনুমোদিত কোনো তেলের ফিলিং স্টেশন বা সাব-ডিলার না থাকায় বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ‘থোড়’ (বুটিং) পর্যায়ে থাকা ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে সেচ ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পাট চাষও।
স্থানীয় খুচরা তেল বিক্রেতা নুর উদ্দিন ইসলাম (পরাগ) বলেন, পাশের বোয়ালমারীসহ বিভিন্ন উপজেলার অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে ট্যাংক লরিতে করে তেল এনে তারা বিক্রি করতেন। কিন্তু চলমান সংকটে সেই সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কৃষকদের কাছে তেল পৌঁছানো যাচ্ছে না এবং সেচ পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
উপজেলায় কোনো অনুমোদিত সাব-ডিলার না থাকায় কৃষক ও খুচরা বিক্রেতারা দীর্ঘদিন ধরেই পার্শ্ববর্তী উপজেলার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সংকটের সময়ে এই নির্ভরতা এখন বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।

কৃষকদের ভাষ্য, ধান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এই সময় কয়েক দিন সেচ না হলে পুরো জমির ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অনেকেই ২ থেকে ৩ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছেন, যা নিয়ে তারা চরম উদ্বেগে আছেন।
এদিকে তেলের সংকটের প্রভাব পড়েছে ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘সোনালী আঁশ’খ্যাত পাট চাষেও। ট্রাক্টরে তেল না পাওয়ায় জমি প্রস্তুত করতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে নির্ধারিত সময়ে পাটের জমি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি সেচের অভাবে বপন করা পাট বীজ থেকেও চারা গজানো নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, সময়মতো সেচ না পেলে পাটের বীজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, এতে পুরো মৌসুমই হুমকির মুখে পড়বে।
খুচরা বিক্রেতারা অভিযোগ নিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এ কে এম রায়হানুর রহমান এর কাছে গেলে তিনি জানান, উপজেলায় তেলের পাম্প না থাকায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করা কঠিন।
উপজেলা পর্যায়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে জেলা প্রশাসক, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং সংশ্লিষ্ট অয়েল কোম্পানির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জরুরি সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ এবং উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৭ অনুযায়ী কৃষি উৎপাদন বিঘ্নিত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।
পেট্রোলিয়াম আইন, ২০১৬ অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ তদারকির দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। বর্তমানে বিপিসি দেশজুড়ে কন্ট্রোল সেল গঠন করেছে। ইতিমধ্যে খুলনা ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ডিজেল সংকটে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা বোরো উৎপাদনে ঝুঁকি তৈরি করছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, যেখানে তেল পাম্প নাই সেই এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে ট্যাংকারের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ বা কৃষি খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি নিশ্চিত না করা হলে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত নুর মৌসুমি বলেন, আলফাডাঙ্গায় কোনো তেল পাম্প না থাকায় সরাসরি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ কে এম রায়হানুর রহমান মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। কোথাও অবৈধ মজুদ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা ভেজিল্যান্স কমিটির সভাপতি, মিন্টু বিশ্বাস বলেন, বিভিন্ন পাম্পেই তেল নেই। “আলফাডাঙ্গায় তেল পাবো কোথায়—যেখান থেকে তেল দেওয়ার কথা, সেখানেই তেল নেই।” কৃষি কাজে সেচ ও চাষাবাদ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
এ অবস্থায় কৃষক ও খুচরা বিক্রেতারা দ্রুত জেলা প্রশাসন, বিপিসি ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের আশঙ্কা, বোরো মৌসুমের এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে ব্যাপক ফসলহানি অনিবার্য হয়ে উঠবে।
মন্তব্য করুন